হাওজা নিউজ এজেন্সি: পরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন রেজা ইউসুফজাদেহ ‘ভালোবাসার মাধ্যমে শিশুর একগুঁয়েমি নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারাংশ তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন: আমার সাত বছর বয়সী ছেলে অত্যন্ত একগুঁয়ে ও অবাধ্য। পোশাক পরা, খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে ঘুমানো পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই সে আমার নির্দেশের বিপরীত কাজ করে। বকাঝকা বা শাস্তি দিয়েও কোনো ফল পাচ্ছি না। এমনকি উৎসাহ দেওয়া বা পুরস্কার দেওয়াও তার কাছে আকর্ষণীয় নয়। মনে হচ্ছে, পরিস্থিতি আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং আমি প্রায়ই তার ওপর চিৎকার করে ফেলছি। এ অবস্থায় কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক কোনো সমাধান কী আছে?
উত্তর: এই বিষয়টি দুটি দিক থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি হলো পারিবারিক পরিবেশ ও পারিবারিক সম্পর্ক, আর অন্যটি হলো মায়ের ব্যক্তিত্ব ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য।
প্রথমে পারিবারিক পরিবেশের বিষয়টি দেখা যাক। বর্ণিত হয়েছে:
الولد الصالح ریحانة من ریاحین الجنة
অর্থাৎ, ‘সৎ সন্তান জান্নাতের ফুলগুলোর একটি।’
এই উপমাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি ফুল যেমন বেড়ে ওঠার জন্য ভালো মাটি, পর্যাপ্ত পানি ও যথাযথ আলো প্রয়োজন, তেমনি শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্যও উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন।
এখানে ‘মাটি’ হলো বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্পর্ক। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যদি উত্তেজনা, মানসিক চাপ, দ্বন্দ্ব কিংবা রুক্ষতায় পূর্ণ হয়, তাহলে ঘরের পরিবেশ অনুর্বর মাটির মতো হয়ে যায়। এমন পরিবেশে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে সন্তানকে বেড়ে তোলা কঠিন।
ঘরের পরিবেশকে একটি অ্যাকুয়ারিয়ামের সঙ্গেও তুলনা করা যায়। পানির তাপমাত্রা অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম হয়ে গেলে ছোট মাছগুলোই সবচেয়ে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে, পরিবারে অশান্তি ও উত্তেজনা থাকলে শিশুরাই সবচেয়ে দ্রুত মানসিক চাপ ও অস্থিরতার শিকার হয়।
এ কারণেই বলা হয়, সন্তান প্রতিপালনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্পর্ককে সুস্থ রাখা। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যদি শীতল, রুক্ষ, আক্রমণাত্মক কিংবা দ্বন্দ্বপূর্ণ হয়, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি সন্তানের আচরণে প্রতিফলিত হয়।
লবণাক্ত অনুর্বর মাটিতে যেমন কোনো ফুল সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারে না, তেমনি ঝগড়া ও মানসিক চাপে পূর্ণ পরিবেশে শিশুর পক্ষেও শান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠা কঠিন।
বর্ণনায় এসেছে, সন্তানের অন্যতম অধিকার হলো—বাবা সন্তানের মাকে সম্মান করবেন ও তাকে আনন্দিত রাখবেন এবং মা-ও সন্তানের বাবার সঙ্গে একইভাবে আচরণ করবেন। বিষয়টি লক্ষণীয় যে, এটিকে সন্তানের ‘অধিকার’ বলা হয়েছে। কারণ, বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রভাব সরাসরি সন্তানের ওপর পড়ে।
বাবা-মা যখন পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া করেন, তখন শিশুর ছোট্ট পৃথিবীতে সেটি অনেকটা ‘বিশ্বযুদ্ধের’ অভিজ্ঞতার মতো হয়ে দাঁড়ায়। স্বাভাবিকভাবেই এর ফল হিসেবে শিশুর মধ্যে একগুঁয়েমি, অবাধ্যতা ও উদ্বেগজনিত আচরণ দেখা দিতে পারে।
শিশুকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ দিন
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো মায়ের নিজের ব্যক্তিত্ব ও আচরণ।
অনেক বাবা-মা তখনই মনে করেন যে, সন্তানের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে, যখন তারা সন্তানকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান।
কিন্তু সন্তান প্রতিপালন কোনো কুমোরের কাজের মতো নয়। কুমোর যেমন নিজের ইচ্ছামতো মাটির পাত্রের আকৃতি তৈরি করেন, শিশুকে তেমন করে নিজের ইচ্ছামতো গড়ে তোলা যায় না। বরং সন্তান প্রতিপালন অনেকটা বাগানের পরিচর্যার মতো।
এ ক্ষেত্রে আপনার দায়িত্ব হলো শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা। যেমন—
• পর্যাপ্ত পানি: অর্থাৎ, শিশুকে ভালোবাসা দেওয়া।
• পর্যাপ্ত আলো: অর্থাৎ, তাকে ছোটখাটো বিষয়ে পছন্দ করার সুযোগ, সীমিত স্বাধীনতা এবং নিজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া।
• উপযুক্ত মাটি: অর্থাৎ, বাবা-মায়ের মধ্যে সুস্থ, শান্ত ও সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখা।
এই তিনটি বিষয় যথাযথভাবে নিশ্চিত করা গেলে শিশুর আচরণও ধীরে ধীরে আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত কঠোরতা কিংবা শিশুকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা তার প্রতিরোধ ও একগুঁয়েমি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সহজভাবে বলতে গেলে, করণীয় হলো—শিশুকে বারবার নির্দেশ দেওয়া ও তার ওপর চিৎকার করার পেছনে নিজের শক্তি ব্যয় না করে প্রথমে ঘরে শান্ত পরিবেশ তৈরি করা, জীবনসঙ্গীর সঙ্গে ভালোবাসাপূর্ণ ও সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সন্তানকে ছোটখাটো বিষয়ে নিজের পছন্দ জানানোর সুযোগ দেওয়া।
এই ভিত্তিগুলো তৈরি করা গেলে শিশুর অনেক আচরণগত সমস্যা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।
আপনার কমেন্ট